লোড হচ্ছে...
রুকইয়াহ শারইয়্যাহ—কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে একটি পরিচিতি
মানুষের জীবনে অসুস্থতা, কষ্ট, ভয়, দুশ্চিন্তা ও বিভিন্ন ধরনের বিপদ আসতে পারে। ইসলাম এসব সমস্যার ক্ষেত্রে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করার পাশাপাশি বৈধ চিকিৎসা ও শরিয়াহসম্মত উপায় গ্রহণের শিক্ষা দিয়েছে।
রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সেই বৈধ উপায়গুলোর একটি—যার ভিত্তি হলো কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম ও গুণাবলি এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে প্রমাণিত দোয়া ও যিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে শিফা প্রার্থনা করা।
রুকইয়াহ কোনো জাদুকরী পদ্ধতি নয়, কোনো গায়বি তথ্য জানার মাধ্যমও নয়। বরং এটি মূলত আল্লাহর কালাম ও শরিয়াহসম্মত দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছেই আরোগ্য প্রার্থনা করা।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা জরুরি—
আরবি رُقْيَة (রুকইয়াহ) শব্দের অর্থ হলো দোয়া, ঝাড়ফুঁক বা এমন পাঠ, যার মাধ্যমে কোনো কষ্ট বা অসুস্থতার ক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে আশ্রয় ও আরোগ্য প্রার্থনা করা হয়।
রুকইয়াহ শারইয়্যাহ বলতে এমন রুকইয়াহ বোঝায়, যা শরিয়াহসম্মত পদ্ধতিতে করা হয় এবং যাতে শিরক, কুফরি কথা, অজানা মন্ত্র বা হারাম কোনো উপাদান থাকে না।
রাসুলুল্লাহ ﷺ রুকইয়াহকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেননি; বরং শিরকমুক্ত রুকইয়াহকে অনুমোদন করেছেন।
আওফ ইবনু মালিক আল-আশজাঈ (রাঃ) বলেন, আমরা জাহেলি যুগে রুকইয়াহ করতাম। আমরা রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করলাম, এ ব্যাপারে আপনার মত কী? তিনি বললেন—
অর্থ: “তোমরা তোমাদের রুকইয়াগুলো আমার কাছে পেশ করো। যেসব রুকইয়ায় শিরক নেই, সেসব রুকইয়ায় কোনো সমস্যা নেই।”
সূত্র: সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২০০।
আল্লাহ তাআলা কুরআনকে মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
অর্থ: “আমি কুরআনের এমন কিছু নাজিল করি, যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত; আর তা জালিমদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করে।”
সূত্র: সূরা আল-ইসরা, ১৭:৮২।
রুকইয়াহর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আকিদাগত বিষয় হলো—রাকী শিফাদাতা নন, কোনো আয়াত বা বস্তু নিজস্ব ক্ষমতায় শিফা দেয় না; শিফা আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।
আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম (আঃ)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন—
অর্থ: “আর আমি যখন অসুস্থ হই, তখন তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন।”
সূত্র: সূরা আশ-শু‘আরা, ২৬:৮০।
তাফসিরে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে যে চিকিৎসার বিভিন্ন মাধ্যম গ্রহণ করা হলেও আরোগ্যদানের প্রকৃত ক্ষমতা আল্লাহরই।
কুরআন পড়ব → দোয়া করব → বৈধ মাধ্যম গ্রহণ করব → শিফার জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করব।
হ্যাঁ। রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে রুকইয়াহ করেছেন এবং তাঁর ওপরও রুকইয়াহ করা হয়েছে।
আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত—
অর্থ: “রাসুলুল্লাহ ﷺ যখন অসুস্থ হতেন, তখন তিনি নিজের ওপর মুআউইযাত (সূরা আল-ফালাক ও সূরা আন-নাস) পড়ে ফুঁ দিতেন।”
সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫০১৬।
রুকইয়াহর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো সূরা আল-ফাতিহার মাধ্যমে রুকইয়াহর ঘটনা।
আবু সাঈদ আল-খুদরি (রাঃ) থেকে বর্ণিত, সাহাবিদের একটি দল সফরে ছিল। একটি গোত্রের প্রধানকে সাপে দংশন করলে সাহাবিদের একজন সূরা আল-ফাতিহা পড়ে তার ওপর রুকইয়াহ করেন। আল্লাহর ইচ্ছায় লোকটি সুস্থ হয়ে যায়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ঘটনাটি শুনে বলেন—
অর্থ: “তুমি কীভাবে জানলে যে এটি রুকইয়াহ? তোমরা সঠিক কাজই করেছ।”
সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫৭৪৯।
ইসলামে ‘আয়ন’ বা বদনজর-এর বিষয়টি হাদিসে এসেছে এবং এর জন্য রুকইয়াহ করার অনুমতিও পাওয়া যায়।
আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত—
অর্থ: “রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে বদনজরের জন্য রুকইয়াহ করতে নির্দেশ দিতেন।”
সূত্র: সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১৯৫a।
আর আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বদনজর, বিষাক্ত দংশন ও কিছু ত্বকসংক্রান্ত সমস্যার ক্ষেত্রে রুকইয়াহর অনুমতি দিয়েছেন।
সূত্র: সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১৯৬b।
আয়িশা (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ অসুস্থ ব্যক্তির জন্য দোয়া করতেন—
অর্থ: “হে মানুষের প্রতিপালক! কষ্ট দূর করে দিন। শিফা আপনার হাতেই। আপনি ছাড়া তা দূর করার কেউ নেই।”
সূত্র: সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১৯১f।
রুকইয়াহ শারইয়্যাহকে প্রচলিত বিভিন্ন কুসংস্কার, গণনা বা জাদুবিদ্যার সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়।
রুকইয়াহ—
অসুস্থতা বা বিপদের সময় মানুষ সহজ সমাধান খুঁজতে গিয়ে অনেক সময় গণক, জ্যোতিষী বা গায়ব জানার দাবিদার ব্যক্তির কাছে যায়।
ইসলাম এ ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করেছে।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি—চিকিৎসা ও গায়ব জানার দাবি এক বিষয় নয়। একজন চিকিৎসক রোগ নির্ণয়ের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারেন; একজন রাকীও রোগীর উপসর্গ শুনে শরিয়াহসম্মত পরামর্শ দিতে পারেন। কিন্তু কেউ যদি অদৃশ্য জগতের খবর জানার দাবি করেন বা জিনের মাধ্যমে গোপন তথ্য জানার দাবি করেন, সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
এটি রুকইয়াহর ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
ঘুমের সমস্যা, ভয়, অস্থিরতা, মাথাব্যথা, শরীরের বিভিন্ন অস্বস্তি, দুশ্চিন্তা, হতাশা, পারিবারিক সমস্যা কিংবা আচরণগত পরিবর্তনের বহু শারীরিক ও মানসিক কারণ থাকতে পারে।
তাই শুধু কোনো একটি উপসর্গ দেখে নিশ্চিতভাবে বলা উচিত নয়—
“আপনার জিনের সমস্যা আছে।”
“আপনার ওপর জাদু করা হয়েছে।”
“আপনার ওপর বদনজর নিশ্চিত।”
বরং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা-পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং শরিয়াহসম্মত রুকইয়াহ—সব বৈধ মাধ্যম বিবেচনা করা উচিত।
রুকইয়াহর মূল পদ্ধতি অত্যন্ত সরল—
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিজের ওপর মুআউইযাত পড়ে ফুঁ দেওয়ার বিষয়টি সহিহ বুখারিতে প্রমাণিত।
সেল্ফ রুকইয়াহ হলো নিজের জন্য নিজেই কুরআন ও সহিহ দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে শিফা প্রার্থনা করা।
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একজন মুসলিমের আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। নিজের জন্য দোয়া করতে কোনো মধ্যস্থতাকারী অপরিহার্য নয়।
নিজের ওপর রুকইয়াহর ক্ষেত্রে—
—এসবের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া যায়।
সূরা আল-ফালাক ও সূরা আন-নাসকে মুআউইযাত বলা হয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ অসুস্থ হলে এগুলো পড়ে নিজের ওপর ফুঁ দিতেন।
অর্থ: “তিনি যখন অসুস্থ হতেন, তখন নিজের ওপর মুআউইযাত পড়ে ফুঁ দিতেন।”
সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫০১৬।
রুকইয়াহ করার সময় মানুষের মনে যেন এমন ধারণা না আসে যে—
“এই রাকী আমাকে সুস্থ করবেন।”
বরং সঠিক বিশ্বাস হলো—
একইভাবে কোনো পানি, তেল, লবণ, মধু বা অন্য কোনো বৈধ উপকরণকে নিজস্ব ক্ষমতাসম্পন্ন মনে করা যাবে না। কোনো উপকরণ ব্যবহার করলে সেটিকে কেবল বৈধ একটি মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
অর্থ: “আমি যখন অসুস্থ হই, তখন তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন।”
সূত্র: সূরা আশ-শু‘আরা, ২৬:৮০।
রুকইয়াহকে শুধু একটি নির্দিষ্ট সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা ঠিক নয়।
সহিহ হাদিসে রুকইয়াহর ব্যবহার অসুস্থতা, দংশন ও বদনজরসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাওয়া যায়।
তাই রুকইয়াহর সঙ্গে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করা ইসলামের বৈধ চিকিৎসা-ব্যবস্থারই অংশ।
রুকইয়াহর লক্ষ্য শুধু কোনো একটি উপসর্গ দূর করা নয়।
এর মাধ্যমে একজন মুসলিম—
আল্লাহর দিকে ফিরে আসে,
কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি করে,
দোয়া ও যিকিরে অভ্যস্ত হয়,
শিরক ও কুসংস্কার থেকে দূরে থাকে,
এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করতে শেখে।
কুরআন মুমিনের জন্য শিফা ও রহমত—এটি আল্লাহর ঘোষণা।
কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেই সেটিকে জিন বা জাদুর নিশ্চিত প্রমাণ বলা যাবে না।
রোগীকে “তোমার সঙ্গে ভয়ংকর জিন আছে” বা “তোমার জীবন শেষ” ধরনের কথা বলা অনুচিত।
কে জাদু করেছে, কোথায় জাদু রাখা হয়েছে, কতজন জিন আছে—এসব অদৃশ্য বিষয়ের নিশ্চিত জ্ঞান দাবি করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে।
অজানা মন্ত্র, তাবিজের মধ্যে শিরকি লেখা, জিনের সাহায্য নেওয়া বা গণকের কাছে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
রুকইয়াহ করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিশ্চিত ফলাফল দেওয়ার দাবি শরিয়াহসম্মত রুকইয়াহর মৌলিক চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
রুকইয়াহ শারইয়্যাহ কোনো রহস্যময় বিদ্যা নয়; এটি কুরআন, দোয়া, যিকির ও আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের মাধ্যমে শিফা প্রার্থনার একটি শরিয়াহসম্মত মাধ্যম।
এর ভিত্তি তিনটি বিষয়ের ওপর সুস্পষ্টভাবে দাঁড়িয়ে আছে—
আল্লাহ বলেছেন—
“আমি কুরআনের এমন কিছু নাজিল করি, যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত।”
সূরা আল-ইসরা, ১৭:৮২।
রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে রুকইয়াহ করেছেন এবং সাহাবিদের রুকইয়াহ অনুমোদন করেছেন।
শিফা কোনো রাকী, পানি, তেল বা কোনো মাধ্যমের নিজস্ব ক্ষমতায় নয়; শিফা একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে।
তাই একজন মুমিনের পথ হলো—
কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ুন।
সহিহ দোয়া ও সুন্নাহর আমল করুন।
বৈধ চিকিৎসার মাধ্যম গ্রহণ করুন।
শিরক ও কুসংস্কার থেকে দূরে থাকুন।
আর শিফার জন্য একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করুন।
আল্লাহ তাআলাই সর্বোত্তম শিফাদাতা।
বিশিষ্ট রাকী ও ও মেডিকেল চিকিৎসায় কাজ না হওয়া প্যারানরমাল শারীরিক-মানসিক সকল রোগ ও জিন জাদুর রুকইয়াহ শারইয়্যাহ বিশেষজ্ঞ কুরআনিক চিকিৎসক, সিনিয়র সাংবাদিক, জনপ্রিয় বক্তা-কারী ও ইসলামী নাশিদ শিল্পী, সিনিয়র শরয়ী রুকইয়াহ প্রশিক্ষক, দীর্ঘ ৯+ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন রুকইয়াহ বিশেষজ্ঞ :
প্রতিষ্ঠাতা ও মহাপরিচালক, আত-তাহসান রুকইয়াহ সেন্টার বাংলাদেশ।
কুরআন সমস্ত মানবজাতির জন্য রহমত ও আরোগ্য—সরাসরি রোগীর অভিভাবকের জবানবন্দি শুনুন

কুরআন সকল মানুষের জন্য শেফা ও রহমত। একজন হিন্দু মহিলা তার নাতির প্যারানরমাল সমস্যা থেকে কুরআনিক রুকইয়াহর মাধ্যমে আরোগ্য লাভের পর তার অনুভূতির কথা জানালেন।

